সোমবার , আগস্ট ১৯ ২০১৯
শিরোনাম :
Home / অন্যান্য / শিক্ষা / শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের ভোগান্তি : একটি অভিজ্ঞতা-প্রসূত বিশ্লেষণ

শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের ভোগান্তি : একটি অভিজ্ঞতা-প্রসূত বিশ্লেষণ

অ্যাডভোকেট রাম চন্দ্র দাশ :
সম্প্রতি নাটোর আইনজীবী সমিতির একটি বৈরি নোটিশের প্রেক্ষিতে সেলিম মাহমুদ নামে এক শিক্ষানবীশ তার হতাশা প্রকাশ করেন এভাবে —–“শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞ আইনজীবীগণ, হয়তো ভুলে গেছেন আপনারাও একদিন শিক্ষানবীশ ছিলেন, এবং জানেন দুনিয়ায় সবচেয়ে অবহেলিত জীবন হলো আইন পেশায় শিক্ষানবীশ থাকা। কোথায়, আপনারা সেই অবহেলিত শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের পাশে এসে দাঁড়াবেন! অথচ, উল্টো আরো বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন, হায়রে বিবেক!”
“দুনিয়ায় সবচেয়ে অবহেলিত জীবন হলো আইন পেশায় শিক্ষানবীশ থাকা”—– এই কথাটির মর্মার্থ অনুভব করতে হলে সমব্যাথী হয়ে শিক্ষানবীশদের ভোগান্তির দিকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তাকাতে হবে। শত ব্যস্ততার কারণে তাদের দিকে কারো তাকানোর সময় খুবই কম। এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধটি বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা-প্রসূত তথ্য-উপাত্তের (ইম্পিরিক্যাল ড্যাটা) মাধ্যমে একটি বিশ্লেষণাত্মক লেখা। এটি পড়ে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোন্ডারদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে যেন নতুনভাবে চিন্তার উদ্রেক ও সমবেদনার সৃষ্টি হয়-এই প্রত্যাশায় এই লেখার অবতারণা-
(১) বিলম্বিত পরীক্ষা নীতি : বন্তুত এটা শিক্ষানবীশদের ভোগান্তির প্রধানতম কারণ। ২০১২ সালের পূর্বে গড়ে ৮ মাসে একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো (যদিও ৬ মাসে করার নিয়ম ছিল), সেখানে বর্তমানে দুই-আড়াই বছর পর পর পরীক্ষা হচ্ছে। কোন কারণে একবার কেউ ফেল করলে (এমনকি ভাইভাতেও) ৫-বছর নিয়ে টান দিচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় সব পরীক্ষার ফলাফল প্রদানে সময় কমেছে, তবে এনরোলমেন্ট পরীক্ষার ক্ষেত্রে বেড়েছে। শুধু তাই নয়, ২০১২ সালে বার কাউন্সিল সরকারের অনুমোদন নিয়ে বিধি পরিবর্তন করে এমসিকিউ পরীক্ষা যোগ করা হয়েছে এবং প্রতি ৬-মাসে পরীক্ষা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে ২০১৭ সালে আপিল বিভাগ এক রায়ে প্রতি বছর একবার এনরোলমেন্ট পরীক্ষা নেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রিতার ফলে,

এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকে মেধাবীরা আইনপেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন;

তাদের জীবন থেকে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে (গড়ে ২ বছর);

পারিবারিক জীবনে দুঃসহ যন্ত্রণা নেমে আসে, এমনকি কারো কারো বিয়ে-সাদি পর্যন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়;

দীর্ঘসময় শিক্ষানবীশী করতে করতে একঘেয়েমি লেগে যায়, পেশার প্রতি বিরক্তি ও অনাগ্রহ তৈরি হয়;

কেউ কেউ বাঁকা পথে উপার্জন করতে বাধ্য হয়, এবং

সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব তৈরি হচ্ছে। সর্বোপরি একে অপরকে দোষাদোষি ও হিংসা বাড়ছে; বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ও বয়স্ক শিক্ষানবীশরা এর শিকার হচ্ছে বেশি। আরো দুর্ভাগ্যের বিষয় হল- যারা কোর্টে নিয়মিত অনুশীলন করেন এই সমস্যাগুলোর কারণেতাদের ভোগান্তিই সবচেয়ে বেশি হচ্ছে।

(২) অর্থনৈতিক সমস্যা : বান্তুত, একজন শিক্ষানবীশকে অনেক সিনিয়ররা অতি অল্প পরিমান সম্মানী (৫০-২০০) দেন তা দিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার পকেট খরচ, দুপুরের খাবার, নাস্তা ও ভাড়ার খরচ মিটানোই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই জেলা শহরে যাদের বাড়ি নাই, তাদের পক্ষে যখন বছরের পর বছর ব্যয় করতে হয়, তখন একদিকে পরিবার থেকে টাকা এনে নিজে চলা পরিবারের জন্য খুবই কষ্টের, আবার অন্যদিকে যাদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ অথচ আইনপেশা গ্রহণের প্রবল আগ্রহ তাদের জন্য এই পেশায় টিকে থাকাই সত্যই কঠিন।

(৩) অবজ্ঞা ও মর্যাদাহীনতা : এ সমস্যাটি যত দিন যাচ্ছে ততই তীব্রতর হচ্ছে। বেশকিছু ক্ষেত্রে শিক্ষানবীশরা কিছু সিনিয়রদের কাছ থেকে, অনেক মুহুরিদের কাছ থেকে এবং চেম্বারের অনেক জুনিয়র আইনজীবীদের কাছ থেকে প্রায়ই অমর্যদাকর আচরণের শিকার হন। কিছু সিনিয়র আছেন শিক্ষানবীশদের অনেক সাধারণ কাজের আদেশ দেন যা বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে শোভন নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বসার জায়গা থাকে না।কিছুদিন যাবৎ হঠাৎ করে লাল-টাই পরার সিদ্ধান্তটিও অনেক শিক্ষানবীশের মনোকষ্টের কারণ হয়ে উঠেছে।

(৪) ৬-মাস শিক্ষানবীশকাল শেষে চেম্বার ও কোর্টে যেতে আপত্তি : শিক্ষানবীশদের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণকাল সময় ৬-মাস, কিন্তু পরীক্ষা দেরিতে হওয়ার কারণে, ফলাফল দেরিতে বের হওয়ার কারণে, এক বা একাধিকবার পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণে কমপক্ষে আড়াই-বছরের নিচে একজন শিক্ষানবীশ, আইনজীবী হতে পারেন না। কিন্তু ইদানিং কিছু কিছু বারে দেখা যাচ্ছে কিছু বিজ্ঞ আইনজীবী আবার কোন কোন আইনজীবী সমিতি শিক্ষানবীশদের ৬-মাস প্রশিক্ষণকাল শেষ হওয়ার পর তাদের চেম্বারে বা কোর্টে যেতে নিরুৎসাহিত বা বারণ করছেন (নাটোর ও চাঁদপুর আইনজীবী সমিতির এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও নোটিশ খুবই সাম্প্রতিক উদাহরণ)।

(৫) ক্রমাগত ফি বৃদ্ধি : বার কাউন্সিল পিউপিলেজ জমাদান ও পরীক্ষার দরখাস্তের ফি ক্রমাগত বাড়িয়েই চলছে। যেমন বিগত বছর পরীক্ষার দরখাস্তের সাথে ফি ছিল ২৯০০ টাকা আর এবার নেওয়া হচ্ছে ৪৭০০। একইভাবে বিভিন্ন আইনজীবী সমিতি নতুন সদস্য পদের ফিও দিন দিন বাড়াচ্ছে। কিছু সমিতি আছে যারা একবারে সদস্য ফি নিয়ে নেন এবং তাদের এককালীন ফিস ৫০,০০০.০০ টাকারও বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে একজন নতুন আইনজীবী কোথা থেকে এত টাকা দিবেন?

(৬) প্রশিক্ষণের কোন সুযোগ নেই : শিক্ষানবীশদের কাজ শেখার কোন সুস্পষ্ট গাইডলাইন নেই; তারা কী কী দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা শিখবে, কিভাবে শিখবে তা অনেকেরই জানা নেই। একেবারেই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই শিখন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। এছাড়া শিক্ষানবীশকালীন সময়ে কোন প্রশিক্ষণ, ওরিয়েন্টেশন বা কর্মশালারও সুযোগ নেই।

(৭) ভাইভা প্রার্থীদেরও দীর্ঘ অপেক্ষা : লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে একজন পরীক্ষার্থী পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে মোট তিনবার ভাইভা পরীক্ষার সুযোগ পান। কোন কারণে ভাইভাতে ফেল করলে তাদেরও পরবর্তী পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হয় অর্থাৎ আরো দুই-আড়াই বছরের ধাক্কা।

(৮) শিক্ষানবীশদের রেফারেন্সে মামলা আসার আপত্তি : দুই/তিন বছর কোর্টে যাওয়ার কারণে সমাজের অনেকেই শিক্ষানবীশদের রেফারেন্সে অনেক সময় মামলা নিয়ে আসে, যা কিছু আইনজীবী অপছন্দ করেন এবং এ সমন্ত শিক্ষানবীশদের টাউট হিসাবে চিহ্নিত করেন। কিছু শিক্ষানবীশ সম্পর্কে অভিযোগ আছে যে, তারা সরাসরি মামলা গ্রহণ করেন এবং গাউন পরে মামলা পরিচালনা করেন যা অবশ্যই দোষনীয়।

(৯) মুখস্থনির্ভর এনরোলমেন্ট পরীক্ষা: বর্তমান পরীক্ষা প্রায় পুরোটাই মুখস্থনির্ভর হওয়ায় যারা কোর্টে অনুশীলন করেন বা আইনের জ্ঞান যথেষ্ট পরিমান আছে, তাদের আইনী জ্ঞান ও শেখা প্রায়োগিক দক্ষতা পরীক্ষায় খুব কমই কাজে লাগে বরং তাদের জন্য পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ঘাটতি থেকে যায়। বরং কোর্টে যারা যায় না বা খুবই কম যায় তারা কোচিং এ পড়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো নিতে পারে।

(১০) মধ্য বা বেশি বয়স্করা কোন কোন ক্ষেত্রে বেআইনী মনোভাবের শিকার : পৃথিবীর প্রায় কোন দেশেই আইনপেশা গ্রহণের কোন সর্বোচ্চ বয়সীমা নেই; বাংলাদেশের আইনও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু বাংলাদেশে একটি স্বার্থন্বেষী মহল প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে মধ্য বা বেশি বয়স্কদের জন্য একটি শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশ তৈরি করছে; এমনকি শুধু বেশি বয়স হওয়ার কারণে ভাইভা-বোর্ডও লজ্জা দিয়ে থাকেন বলে অনুযোগ আছে। অথচ একটি আইনী বিষয়কে শুধুমাত্র বিদ্বেষপ্রসূত শত্রুভাবাপন্ন করা খুবই দুঃখজনক।

(১১) অনেক শিক্ষানবীশদের সিনিয়র পাওয়া বেশ কঠিন : যেসবশিক্ষানবীশদের আইনজীবী আত্মীয়-স্বজন নেই তাদের পক্ষে সিনিয়র (মাস্টার) পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। সিনিয়র মনোনয়নের কোন সহযোগিতমূলক নিয়ম বা প্রতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকায় এটি ব্যাক্তিগতভাবে করতে হয়। শিক্ষানবীশ নেওয়ার প্রথা থাকলেও অনেক আইনজীবী তা নিতে চান না। যার কারণে অনেক শিক্ষানবীশরা সিনিয়রের সাথে কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

(১২) শিক্ষানবীশদের ব্যাপারে সুষ্পষ্ট আইনী বিধি-বিধান নেই : বার কাউন্সিল আদেশ ও বিধি, ১৯৭২ এবং বার এসোসিয়েশনের গঠনতন্ত্রে শিক্ষানবীদের বিষয়টি সম্পর্কে গুরুত্ব সহকারে বলতে গেলে তেমন কোন বিধি-বিধান নাই। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও দেশের উন্নতির সাথে সাথে নতুন আইনজীবী হওয়ার প্রবনতা বৃদ্ধি পাওয়া ‘ব্যাক্তিগত প্রক্রিয়ায় বা প্রথার’ মাধ্যমে শিক্ষানবীশ পরিচালনায় অনেক ধরনের গ্যাপ তৈরি হচ্ছে ও পেশাগত অসুবিধা হচ্ছে এবং শিক্ষানবীশদের হতাশা ও অসন্তোষ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এত ভোগান্তির মাঝেও আরেকজন শিক্ষানবীশ শেখ আমিনুর রহমানের ইতিবাচক প্রত্যাশা এরকম,——–“জুনিয়র আইনজীবী এবং শিক্ষানবীশ আইনজীবীর কান্না, বেদনা, হতাশা দেখার কেউ নেই। বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীদের একটু সহায্য, মানবিক, সহানুভূতি দেখালে এই পেশা আরো বেশী সম্মানিত হতো।”

পরিশেষে, আমার পূর্বের লেখার একটি অনুচ্ছেদ দিয়ে এ লেখাটির উপসংহার টানতে চাই- “সময়ের সাথে সাথে সামাজের চাহিদা বদলায়; এই পরিবর্তিত চাহিদা মোকাবেলায় বিভিন্ন পেশাদারদেরও নতুন জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে হয়। এমনকি, প্রয়োজনে আইন-কানুনও বদলাতে হয়। বিগত ৪৮ বছরে জাতি হিসাবে আমাদের অনেক অর্জন; বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, এমনকি সামাজিক ক্ষেত্রেও; আমরা আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে এবং ২০৪১ সালে উন্নতদেশের স্বপ্ন দেখতে পারছি। এমতাবস্থায় বিভিন্ন পেশার মতো আইন পেশারও অনেক বিস্তৃতি ঘটেছে! অনেক তরুণ আজ ভালো আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন- যা সমাজ, রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার জন্য খুবই আশাব্যাঞ্জক। কিন্তু ইদানিং দেখা যাচ্ছে যে, বর্তমান আইন ও বিধি এবং অন্যান্য সীমাবদ্ধার কারণে শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের ভোগান্তি ও হতাশা বাড়ছে। তবে এসবকিছুর মধ্যে শিক্ষানবীশ ও নতুন আইনজীবীদের প্রতিশ্রুতি ও গুণগত মানের প্রশ্নটি সামনে আসছে- যা একবিংশ শতাব্দীর চাহিদাও বটে। এসব প্রেক্ষিতে আইনজীবীদের অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রনকারী সংগঠন হিসেবে বার-কাউন্সিলের প্রতি প্রত্যাশাও বেড়েছে। এই প্রত্যাশা ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবেলা করা বার-কাউন্সিলের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ! এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বার কাউনিন্সলের বিজ্ঞ কর্তৃপক্ষ ও সরকার অন্যান্য উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের (যেমন মালয়েশিয়া, ভারত,সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি) অভিজ্ঞতার আলোকে একটি বৈজ্ঞানিক ও উন্নত নীতিমালা ও আইনী-কাঠামো তৈরি ও অবলম্বন করবেন এটাই সকলের প্রত্যাশা।”

লেখক: আইনজীবী, ঢাকা জজ কোর্ট।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *